কীভাবে ব্যবসা শুরু করবেন: রাকিবুল ইসলাম রাকিবের বাস্তবিক ধাপে ধাপে গাইড
আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ব্যবসা শুরু করা শুধু একটা সিদ্ধান্ত না, এটা এক ধরনের যাত্রা। এই যাত্রা শুরু হয় একটা ধারণা থেকে, কিন্তু টিকে থাকার জন্য দরকার শক্ত ভিত, স্পষ্ট পরিকল্পনা আর ধৈর্য। অনেকেই ভাবে, ব্যবসা শুরু মানেই ইনভেস্টমেন্ট, দোকান বা ওয়েবসাইট। আসলেই কি তাই? আমি বলি—না। ব্যবসা শুরু করার আসল গল্পটা এর চেয়েও অনেক গভীর। চলুন, ধাপে ধাপে বুঝে নেই।
ধাপ ১: পরিষ্কার একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করুন
প্রথম কাজ হলো—একটা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করা। এটা এমন একটা ডকুমেন্ট যেখানে আপনার ব্যবসার উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, কাদের জন্য পণ্য বা সার্ভিস তৈরি করছেন, কীভাবে বিক্রি করবেন, কোথা থেকে অর্থ আসবে—সবকিছু পরিষ্কারভাবে লিখে ফেলবেন। আমি সবসময় বলি, এটা শুধু অন্যকে দেখানোর জন্য না, নিজের দিকনির্দেশনার জন্যও খুব দরকারি।
যখন আপনি চিন্তা করেন, “আমার বিজনেস অন্যদের থেকে আলাদা কী?”, তখনই আপনি জানতে পারবেন আপনার আসল USP (Unique Selling Proposition) কী। ধরুন আপনি পরিবেশবান্ধব কাপড় নিয়ে কাজ করছেন। তাহলে এটা অন্য ব্র্যান্ড থেকে আলাদা। আপনি যদি এই দিকটা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেন, তাহলে গ্রাহকও বুঝবে আপনি কতটা ভিন্ন।
এখন আর ৩০-৪০ পাতার প্ল্যান কেউ পড়ে না। তাই এটা সংক্ষিপ্ত রাখুন কিন্তু স্পষ্ট রাখুন। খুব বেশি টেকনিক্যাল জিনিস ঢুকিয়ে ফেলবেন না, যেটা কাজে লাগবে না। আর একটা কথা—আপনার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা যেন জীবন্ত থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে আপডেট করুন। নতুন ফান্ডিং পেলেন? নতুন প্রোডাক্ট যুক্ত করলেন? তাহলে প্ল্যানটাও বদলান।
ধাপ ২: আইনি কাঠামো ও রেজিস্ট্রেশন গুছিয়ে নিন
পরিকল্পনা তৈরি হয়ে গেলে, এবার সময় আইনি বিষয়গুলো গুছিয়ে নেওয়ার। এটা অনেকেই এড়িয়ে যেতে চায়, কিন্তু আমি বলি, এই অংশটাই আপনাকে নিরাপদ রাখবে।
প্রথমেই ঠিক করতে হবে, আপনার ব্যবসার গঠন কী হবে। একা করবেন? তাহলে হয়তো একক মালিকানা (Sole Proprietorship) উপযুক্ত। কিন্তু এর মানে হলো—সব লাভ যেমন আপনার, তেমনি সব দায়ও আপনার। আপনি চাইলে অংশীদারিত্ব মডেলেও যেতে পারেন, যেখানে আরও একজন বা একাধিক ব্যক্তি আপনার সঙ্গে থাকবে। তবে যারা ঝুঁকি কমাতে চান এবং চান ব্যক্তিগত সম্পদ আলাদা থাকুক, তাদের জন্য কর্পোরেশন (Corporation) বা লিমিটেড দায় কোম্পানি (LLC) ভালো অপশন।
নাম নির্বাচন করাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমন নাম দিন যেটা মনে থাকবে, সহজ উচ্চারণযোগ্য এবং আপনার ব্যবসার চরিত্রের সঙ্গে মানানসই। একবার নাম ঠিক হয়ে গেলে সেটা সরকারি দপ্তরে রেজিস্টার করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, আপনি যে নামটি রাখতে চাচ্ছেন সেটা আগে কেউ নিয়ে ফেলেছে কি না। প্রয়োজনে ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশনও করে ফেলুন, যেন ভবিষ্যতে কেউ সেটা কপি না করতে পারে।
ধাপ ৩: আপনার গ্রাহক কে তা পরিষ্কারভাবে বুঝে নিন
অনেকেই বলে, “আমি সবার জন্য পণ্য বানাচ্ছি।” আমি তখন বলি, “তাহলে কারও জন্যই না।” আপনাকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে—আপনার গ্রাহক কে? সে কোথায় থাকে? তার বয়স কত? সে কী করে? কী চিন্তা করে? সোশ্যাল মিডিয়াতে কোথায় বেশি সময় দেয়?
এই তথ্যগুলো না জানলে আপনি মার্কেটিং করতে পারবেন না। আমার পরামর্শ—একজন আদর্শ গ্রাহকের (ideal customer) ছবি তৈরি করুন। কাগজে লিখে ফেলুন তার লাইফস্টাইল, প্রয়োজন আর ব্যথার জায়গা। এই ইনফরমেশন আপনাকে সাহায্য করবে সঠিক টোনে কথা বলতে এবং সঠিক চ্যানেলে পৌঁছাতে।
ধাপ ৪: আপনার ব্র্যান্ড পরিচয় গড়ে তুলুন
এই দুনিয়ায় অনেক পণ্য, কিন্তু সফল ব্র্যান্ড গুটিকয়। কেন? কারণ তারা শুধু পণ্য বিক্রি করে না, তারা একটা অনুভূতি বিক্রি করে। আপনি যদি গ্রাহকের মনে জায়গা নিতে চান, তাহলে আপনার ব্র্যান্ডের একটি স্পষ্ট পরিচয় থাকতে হবে।
আপনার ভিশন কী? আপনি কী সমস্যার সমাধান করছেন? আপনার কণ্ঠস্বর কেমন—মজার, সিরিয়াস, বন্ধুর মতো? এগুলো ঠিক করুন এবং প্রতিটি পোস্ট, ওয়েবসাইট, প্যাকেজিং—সবকিছুতে সেটা প্রকাশ করুন। আমি বলি, ব্র্যান্ড না বানালে, শুধু প্রোডাক্ট থাকবে। আর প্রোডাক্টের বাজারে দাম পড়ে, ব্র্যান্ডের নয়।
ধাপ ৫: অনলাইন উপস্থিতি তৈরি করুন
এখনকার বাজারে আপনি অনলাইনে না থাকলে, অনেকটা অদৃশ্য হওয়ার মতো। ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্ট—এইগুলোর মাধ্যমে আপনি গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন।
ওয়েবসাইট তৈরি করুন, যেখানে আপনার পণ্য, কনট্যাক্ট ডিটেইলস, ব্র্যান্ড গল্প—সবকিছু থাকবে। চাইলে একটা ব্লগও রাখতে পারেন, যেখানে আপনি গ্রাহকদের পরামর্শ বা টিপস শেয়ার করবেন। এটা বিশ্বাস তৈরি করে। আর ইমেল মার্কেটিং বা ম্যাসেঞ্জার টুল ব্যবহার করে আগ্রহীদেরকে গ্রাহকে রূপান্তর করুন।
ধাপ ৬: বিক্রয় চালু করুন এবং গ্রাহকদের খুশি রাখুন
আপনার সেলস সিস্টেমও গুছিয়ে ফেলতে হবে। কাস্টমারদের ট্র্যাক করতে CRM সফটওয়্যার ব্যবহার করুন। সেলস টার্গেট ঠিক করুন এবং সেই অনুযায়ী কাজ করুন।
আপনি কিভাবে পেমেন্ট নেবেন, কিভাবে ডেলিভারি হবে, রিটার্ন পলিসি কেমন—এই বিষয়গুলো আগে থেকেই ফাইনাল করুন। একটা ক্লিয়ার সেলস প্রসেস আপনাকে ভবিষ্যতে ঝামেলা থেকে বাঁচাবে।
এবং, আমি যেটা বারবার বলি—গ্রাহক ধরে রাখার ওপর ফোকাস করুন। নতুন গ্রাহক আনা কষ্টের, পুরনো গ্রাহক ধরে রাখা অনেক সহজ। সেজন্য ভালো সার্ভিস দিন, দ্রুত রেসপন্স করুন, আর মাঝে মাঝে চমকও দিন। একটা ডিসকাউন্ট, একটা ধন্যবাদ কার্ড—এমন ছোট জিনিসই বড় প্রভাব ফেলে।
শেষ কথা: শুরুটা কঠিন, কিন্তু সম্ভব
আমি জানি, এই সবকিছু শুনে অনেক কঠিন মনে হচ্ছে। কিন্তু বলছি—শুরুটা কষ্টকর হলেও, একদমই অসম্ভব না। আমি নিজেও শুন্য থেকে শুরু করেছি। কেবল একটা ধারণা, আর অনেক ঘাম ঝরানো পরিকল্পনা নিয়ে পথ চলেছি। আপনি যদি আন্তরিক হন, শিখতে চান আর পরিশ্রমে ভয় না পান, তাহলে আমিও বলতে পারি—আপনি পারবেন।
– Md. Raquibul Islam (Rakib)
Entrepreneur & Businessman