অফিস পলিটিক্স থেকে কিভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন
অফিস পলিটিক্স থেকে নিজেকে পুরোপুরি দূরে রাখা হয়তো সম্ভব না, কিন্তু বুদ্ধিমানের কাজ হলো—এটার মধ্যে ডুবে না গিয়ে, এটাকে নিজের ক্যারিয়ার আর সংগঠনের গ্রোথের জন্য ব্যবহার করা। আমি একজন উদ্যোক্তা হিসেবে দল বানাতে গিয়ে খুব কাছ থেকে দেখেছি, অফিস পলিটিক্সকে যারা “খেলা” মনে করে, তারা কিছু সময়ের জন্য এগিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টিকতে পারে না। টিকে যায় সে–ই, যে ভ্যালু ক্রিয়েট করে, ক্লিন থাকে, আর মানুষের আস্থা ধরে রাখতে পারে।
নীচে আমার অভিজ্ঞতা আর পর্যবেক্ষণ থেকে কিছু কথা শেয়ার করছি—যা আপনার নিজের ক্যারিয়ারকে সুরক্ষিত রাখতে, আর অপ্রয়োজনীয় অফিস পলিটিক্স থেকে নিজেকে বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে।
পলিটিক্স বুঝুন, কিন্তু তাতে ডুবে যাবেন না
প্রথমেই একটা জিনিস বুঝতে হবে—অফিস পলিটিক্স মানেই সব খারাপ কিছু না।
যেখানে মানুষ আছে, যেখানে পাওয়ার, ইন্টারেস্ট আর প্রভাব আছে, সেখানে ন্যাচারালি গ্রুপিং হবে, মত-পার্থক্য হবে, কারও কারও ইনফ্লুয়েন্স বেশি থাকবে। এগুলোই হচ্ছে বাস্তবতা।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন কেউ নিজের অবস্থান শক্ত করার জন্য অন্যকে ছোট করে, গুজব ছড়ায়, ভুল ধরে ব্যঙ্গ করে, কাউকে ইচ্ছা করে “ডাউন” করার চেষ্টা করে।
এগুলোকে পুরোপুরি এড়ানো কঠিন, কিন্তু আপনি চাইলে একটা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—
“আমি অফিস পলিটিক্সে অংশ নেবো কেবল তখনই, যখন সেটা প্রতিষ্ঠান আর টিমের জন্য পজিটিভ কিছু তৈরি করবে, নোংরা খেলা খেলবো না।”
অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখুন
ছোট একটা মনোমালিন্য, অফহ্যান্ড একটা কমেন্ট, সামান্য ভুল বোঝাবুঝি—এসব থেকে অনেক সময় আজীবনের শত্রু তৈরি হয়ে যায়।
অফিসে কিছু মানুষ থাকেই, যারা অন্যের ভুল ধরতে ভালবাসে, সামান্য বিষয় নিয়েও ইগো তৈরি হয়, কথা বাড়াতে থাকে, আড্ডায় গিয়ে সেই বিষয় নিয়ে হাসিঠাট্টা করে। এগুলোতে জড়ালে আপনার এনার্জি নষ্ট হবে, কাজের ফোকাস নষ্ট হবে, আর আপনি অজান্তেই পলিটিক্যাল “গেম”-এর অংশ হয়ে যাবেন।
কাজের জায়গায় একটা জিনিস সবসময় মাথায় রাখুন –
“আমি এখানে কাজ করতে এসেছি, যুদ্ধ করতে না।”
যে বিষয়গুলোতে আপনার ইনপুট সত্যিই ভ্যালু যোগ করবে, কেবল সেগুলোতেই কথা বলুন। বাকি জায়গায় স্মার্টলি চুপ থাকাও অনেক বড় স্কিল।
নিজের কাজে ফোকাস: ফলাফলই আসল ইমেজ বিল্ডার
আপনার কলিগ ফাঁকি দিচ্ছে কি না, সে ঠিকমতো রিপোর্ট দিচ্ছে কি না, সে কতক্ষণ ফেসবুকে বসে – এগুলো দেখে বা আলোচনা করে আপনার কিছুই লাভ হবে না।
কারও কাজের ভুল নিয়ে বস বা অন্যদের কাছে নালিশ করতে গেলে হয়তো সাময়িকভাবে “হিরো” মনে হতে পারে নিজেকে, কিন্তু বেশিরভাগ সময় এতে আপনি আপনার বিরুদ্ধেই একটি শত্রু গ্রুপ বানিয়ে ফেলেন।
বুদ্ধিমানদের স্ট্র্যাটেজি খুব সোজা:
· নিজের KPI / Target / Responsibility–এই জায়গাগুলোতে ১০০% ফোকাস
· কাজের মান, সময়মতো ডেলিভারি আর প্রফেশনাল আচরণ দিয়ে নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করা
· কে কী করছে, কতটা করছে – সেটা বুঝলেও মুখে না আনা
উর্ধ্বতনরা সময়ের সাথে সবই বুঝে ফেলেন। কেউ অল্প সময়ের জন্য পলিটিক্স করে এগিয়ে যেতে পারে, কিন্তু যারা কাজের মাধ্যমে ভ্যালু ক্রিয়েট করে, এফিশিয়েন্ট আর ট্রাস্টওয়ার্দি—তাদের পাশেই শেষ পর্যন্ত বসরা দাঁড়ান।
অন্যের ভুল খুঁজে “হিরো” হওয়ার চেষ্টা বন্ধ করুন
অনেকেরই মানসিকতা থাকে – “আমি ধরব, কে কোথায় ভুল করলো, তারপর সেটা ধরে নিজেকে বেশি স্মার্ট প্রমাণ করব।”
এটা short-term ego boost দেয়, long-term damage করে।
অন্যের ভুল দেখলে দুটো পথ থাকে :
1. সরাসরি, সম্মান রেখে, ব্যক্তিগতভাবে ওই মানুষটাকে বলে হেল্প করা
2. অথবা একেবারেই না জড়িয়ে, নিজের কাজে থাকা
কিন্তু কারও ভুল নিয়ে অন্যের সঙ্গে আড্ডায় আলোচনা করা, পিছনে হাসাহাসি করা, বসের কাছে গিয়ে বলা – এগুলো আপনাকে অফিসে “নিরাপদ” রাখে না; বরং “অবিশ্বাস্য” লিস্টে ঢুকিয়ে দেয়।
সিদ্ধান্তের সাথে একমত না হলেও প্রতিক্রিয়া কন্ট্রোল করুন
প্রতিটি অফিসেই এমন সময় আসবে, যখন আপনি মনে করবেন – “এই ডিসিশনটা একদমই ঠিক হয়নি।” এখন দুইভাবে আপনি রিঅ্যাক্ট করতে পারেন:
· রিঅ্যাক্টিভ মোড: সামনে সামনে রাগ দেখালেন, মিটিংয়ে কণ্ঠ উঁচু করলেন, অন্যদের সামনে বসকে প্রশ্ন করলেন, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেন ইত্যাদি।
· প্রফেশনাল মোড: তথ্য ভিত্তিক ভাবে, ডেটা দিয়ে, ভদ্র ভাবে আপনার কনসার্ন শেয়ার করলেন, সঠিক সময় ও জায়গা বেছে নিয়ে।
উদ্যোক্তা হিসেবে আমি আমার টিমে সবসময় একটা কথা বলি –
“Disagree করো, কিন্তু Disrespect করো না।”
আপনার চোখে কাজটা ভুল হলেও, কন্ট্রোলড টোনে, সম্মান রেখে, কর্পোরেট কালচার মেনে কথা বলতে শিখুন। তর্ক, চিৎকার, হতাশা দেখানো – এগুলো আপনার বিরুদ্ধে পলিটিক্সের নতুন দরজা খুলে দেয়।
গসিপ, গুজব আর ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলানো থেকে দূরে থাকুন
অফিসে গসিপ (পরচর্চা) টেবিল যেকোনো সময় তৈরি হয়ে যায় –
কে কার সাথে সম্পর্কে আছে, কার সংসারে ঝামেলা, কে কত বেতন পায়, কে কাকে কী বলেছে…
এগুলো হয়তো শুরু হয় মজা দিয়ে, শেষ হয় কষ্ট আর পলিটিক্স দিয়ে।
· অন্যের ব্যক্তিগত সমস্যায় নিজেকে জড়াবেন না, প্রয়োজন না থাকলে মতামতও দেবেন না।
· কারও পার্সোনাল লাইফ, পারিবারিক বিষয়, আর্থিক অবস্থা – এসব নিয়ে আলোচনা করবেন না।
· নিজের মধ্যেও যদি গুজব ছড়ানোর খারাপ অভ্যাস থাকে, সৎভাবে চেষ্টা করে এখনই বাদ দিন।
মনে রাখবেন, আজ আপনি কারও সম্পর্কে যেভাবে কথা বলছেন, অন্যেরা অন্যদিন আপনার সম্পর্কেও একইভাবে কথা বলবে।
নিজের মেজাজকে ট্রেইন করুন
বাড়ির পরিবেশে যেমন খারাপ মেজাজ দেখালে পরে মানিয়ে নেওয়া যায়, অফিসে তেমন না।
একবার আপনি রাগ করে কাউকে অপমান করলেন, চেঁচিয়ে কথা বললেন, টেবিল ঠুকলেন – মানুষ সেটা খুব ভালো করে মনে রাখে।
এর পর থেকে পলিটিক্সের গ্রুপগুলো আপনাকে “ট্রিগার” করার চেষ্টা করবে, কারণ তারা জানে – আপনাকে একটু ধাক্কা দিলেই আপনি রিঅ্যাক্ট করবেন, আর তাতেই আপনার ইমেজ নষ্ট হবে।
নিজেকে একটু ট্রেইন করুন:
· রাগ উঠলে ইমিডিয়েট রিপ্লাই না দিয়ে কিছুটা সময় নিন
· খুব ইমোশনাল অবস্থায় ইমেইল বা মেসেজ লিখবেন না
· যে ধরনের কথা আপনার বিরুদ্ধে কেউ বলুক আপনি চান না, সেভাবে কারও সাথে কখনো কথা বলবেন না
ক্লিয়ার পারসোনাল গোল রাখুন – আর তাতে ফোকাস করুন
যে অফিসে কাজ করছেন, সেখানে আপনার নিজের লক্ষ্য কী?
· নির্দিষ্ট একটা পজিশনে যেতে চান?
· স্পেসিফিক স্কিল মাস্টার করতে চান?
· কিছু বছর পর নিজে কিছু শুরু করতে চান?
যখন আপনার ভেতরে ক্লিয়ার গোল থাকে, তখন ছোটখাটো পলিটিক্স আপনাকে খুব বেশি নেড়ে দিতে পারে না।
কারণ আপনার ফোকাস চলে যায় এই প্রশ্নের দিকে –
“এই ঝামেলায় জড়িয়ে আমার গোলের কোনো লাভ হচ্ছে?”
নিজের ডেভেলপমেন্ট – নতুন স্কিল শেখা, প্রেজেন্টেশন ভালো করা, কমিউনিকেশন স্কিল বাড়ানো, টেকনিক্যাল এক্সপার্টিজ তৈরি করা—এসব জিনিসেই ইনভেস্ট করুন। এগুলোই পরের ৫–১০ বছরে আপনাকে এগিয়ে রাখবে, কার পেছনে কে কী বলল – সেটা না।
কাজকে ভালোবাসুন, মানুষকে রেসপেক্ট করুন
যাদের কাজে ডেডিকেশন থাকে, ওনারশিপ থাকে, দায়িত্ববোধ থাকে—উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সবার আগে তাদেরকে মনে রাখেন।
আপনি যদি
· সময়মতো ডেলিভার করেন
· কমপ্লেইন কম করেন, সলিউশন বেশি দেন
· অন্যকে হেল্প করেন কিন্তু কাউকে হেয় করেন না
তাহলে অফিসে আপনার জন্য একদল “সাইলেন্ট সাপোর্টার” তৈরি হয়ে যাবে, যারা সুযোগ পেলে আপনাকে রিকমেন্ড করবে, ডিফেন্ড করবে, পাশে দাঁড়াবে। এটাই হচ্ছে সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর “পলিটিক্স”—যেখানে সবাই একে অন্যকে গ্রো করতে সাহায্য করে।
নিজের লিমিট জানুন – আর নোংরা পলিটিক্সে ‘না’ বলুন
অনেকেই নিজের পজিশন ভালো করার জন্য সচেতনভাবেই অন্যের বিরুদ্ধে পলিটিক্স করে –
কারও গোপন কথা ফাঁস করে, বসের কাছে অন্যের নাম করে, কারও ক্রেডিট কেটে নিজের নামে নিয়ে নেয়।
মাথায় রাখবেন,
নোংরা পলিটিক্স করে হয়তো ওপরে ওঠা যায়, কিন্তু সেখানে টিকে থাকা যায় না।
আপনি যেভাবে উপরে উঠবেন, একদিন ঠিক সেভাবেই কেউ আপনাকে নিচে নামিয়ে দেবে।
নিজেকে একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করতে পারেন –
“আমি কখনো কারও সুনাম নষ্ট করে, ইচ্ছা করে কারও প্রাপ্য কেটে নিয়ে, বা অন্যের ক্ষতি করে বড় হবো না। আমি নিজের কাজ, নিজের যোগ্যতা আর নিজের ভ্যালু দিয়ে বড় হবো।”
শেষ কথা
অফিস পলিটিক্স থেকে সম্পূর্ণ পালিয়ে থাকা যায় না, কিন্তু নিজের জন্য একটা ক্লিয়ার প্রিন্সিপল ঠিক করা যায়।
· মানুষের প্রতি সম্মান
· কথায় ও আচরণে সততা
· কাজের প্রতি ডেডিকেশন
· অপ্রয়োজনীয় কনফ্লিক্ট এড়িয়ে চলা
· গসিপ, গুজব আর নোংরা খেলাকে “না” বলা
এই কয়েকটা জিনিস ধরে রাখতে পারলে, হয়তো আপনি খুব দ্রুত “ড্রামাটিক” গ্রোথ পাবেন না, কিন্তু আপনি স্টেবল গ্রোথ পাবেন, ক্লিন ইমেজ পাবেন, আর রাতের ঘুমটাও শান্তিতে হবে।
একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমি বরাবরই এমন মানুষ খুঁজি, যারা পলিটিক্স দিয়ে নয়, কাজ দিয়ে প্রমাণ করে—
“আমার ভ্যালু আছে, আর আমি এই সংগঠনের জন্য সত্যিই দরকারি।”
আপনি চাইলে আজ থেকেই নিজেকে সেই ধরনের মানুষ বানানোর কাজ শুরু করতে পারেন।